শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কি সত্যি ‘ছুটি’ চলছে…?

প্রকাশিত: ৯:২৯ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২১
নানা মহল থেকে প্রায়শই বলা হচ্ছে, দেশের সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ মাস ধরে ছুটি চলছে। অনেক গণমাধ্যমের খবরেও বলা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘ছুটি’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে বেড়েই চলছে। কেউ আবার লিখছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি ‘আবার বাড়ল’। আসলেই কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে? কিংবা এক বছরের বেশি সময় ধরে ছুটি ভোগ করছেন শিক্ষকরা? দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রমের দিকে তাকালেই প্রশ্নগুলোর সমাধান মিলবে।
দেশের প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দিলেই দেখা যাবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল স্তরে অনলাইন পাঠদান চলমান। ৪০-৫০ মিনিটের একটি অনলাইন ক্লাসের জন্য একজন শিক্ষককে কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। তবে শিক্ষকের প্রযুক্তি জ্ঞান, দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এ সময় কম-বেশি হতে পারে। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের জন্য স্লাইড তৈরি, স্লাইড অনুযায়ী প্রস্তুতি, রেকর্ডিং (কখনো কখনো একই ক্লাস একাধিকবার রেকর্ডিং), রেকর্ডিং শেষে এডিটিং এবং সবশেষে ক্লাসের নির্ধারিত সময়ে তা ডেলিভারি করা। প্রশ্ন হলো, এই অনলাইন পাঠদানের মাধ্যমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শেষ? এককথায় উত্তর, ‘না’। পাঠদানের বাইরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেসব কাজ চলমান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
# জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র সংগ্রহ, মূল্যায়ন ও প্রধান পরীক্ষকের নিকট প্রেরণ। # জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নোটিশ অনুযায়ী চতুর্থ বর্ষের অনলাইনে ভাইভার প্রস্তুতি ও ভাইভা সম্পন্ন করা
# সরকার কর্তৃক নির্দেশিত প্রতিদিনকার প্রশাসনিক সকল কাজ। # প্রতিষ্ঠান প্রধানের নির্দেশনা মোতাবেক বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানে হাজির, জুম মিটিং ও গুগল মিটে মিটিং।
# একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং (সরাসরি উপস্থিত হয়ে এবং অনলাইন উভয় মাধ্যমেই।
# রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হওয়া। জুম মিটিং আয়োজন করে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরা।
# অনলাইনে মাসিক ও বাৎসরিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আয়োজন।
# পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, অনলাইনে ইনপুট, উত্তরপত্র মূল্যায়ন,ফলাফল প্রস্তুতকরণ,শিক্ষার্থীদের অবহিতকরণ, বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন-অভিযোগের সমাধান।
# অনলাইন ক্লাসের দক্ষতা অর্জনের জন্য অনলাইনে ‘ইনহাউজ’ প্রশিক্ষণের আয়োজন।
# নায়েমের চলমান বিভিন্ন ট্রেনিং কার্যক্রমে অংশগ্রহণ।
# মাউশির প্রশিক্ষণ শাখা হতে বিভিন্ন অনলাইনে বার্ষিক কর্ম সম্পাদন চুক্তি, শুদ্ধাচার প্রশিক্ষণ, ই-নথি প্রশিক্ষণসহ আরও অন্যান্য অনলাইন প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ।
# প্রতিটি কলেজের সুষ্ঠু পরিবেশ ও সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে সপ্তাহে ছয় দিন শিক্ষকবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত ভিজিলেন্স টিমের কর্ম তৎপরতা কলেজগুলোতে অব্যাহত থাকে। তাহলে কী দাঁড়াল? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরবিচ্ছিন্ন ছুটি চলছে না। শিক্ষকরাও ছুটি ভোগ করছেন না। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সরাসরি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ’ আছে এটি বলাই সমীচীন হবে। সরকারি অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতো অফিস-আদালতে গিয়ে শিক্ষকরা কাজ করছেন না-এটা সত্যি। তবে তারাও নিয়মিত কাজ করছেন। একটু ভিন্নভাবে। মাসের পর মাস এভাবে কাজ করা শিক্ষকদের জন্য মোটেই স্বস্তির নয়। খুশির বিষয় তো নয়ই। তবু এটা করতে হচ্ছে করোনা মহামারীর মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যুঝুঁকির কথা মাথায় রেখে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যেন সুস্থ থাকতে পারে।
একইসঙ্গে শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রেও তারা যেন খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ১৫ মাস ধরে শিক্ষকরা কোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ছাড়াই যেভাবে অনলাইন পাঠদানসহ বিভিন্ন ভার্চুয়াল মিটিং,অনলাইন সেমিনার পরিচালনা করে যাচ্ছেন তা জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে এটি। প্রাসঙ্গিক আলোচনার সূত্র ধরেই শিক্ষকদের বঞ্চনা ও আক্ষেপের একটি জায়গার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। বিষয়টা পরিষ্কার করছি। শিক্ষকগণ জুমের ফ্রি ভার্সন ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায়ই সময়সীমার প্রতিবন্ধকতায় পড়ে যান। ক্লাস বা মিটিং বন্ধ হয়ে গেলে পুনঃসংযোগ হবার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী অনেকেই বিড়ম্বনায় পড়েন। ফ্রি জুম অ্যাপস ব্যবহারে ৪০ মিনিটের সীমাবদ্ধতা, অংশগ্রহণকারীর সীমাবদ্ধতা দূর করতে শিক্ষকবৃন্দ জুমের Education বা pro version এর প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন ব্যবহার করেন। যেটাকে আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি Zoom paid version। অনেকেই বাৎসরিক চুক্তিতে মাসিক পে করেন। অনেকে আবার মাসিক ভিত্তিতে বিভিন্ন প্যাকেজ কেনেন। অনলাইনে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত হয়ে মিটিং বা পাঠদান কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একজন শিক্ষক নিজ উদ্যেগে এসব প্যাকেজ কিনে থাকেন।
অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্যাকেজও কিনতে হয় কিংবা ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের কাছ থেকে ওয়াই-ফাই এর কানেকশন নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এখানে অর্থ ব্যয়ের একটি বাধ্যবাধকতা ওই শিক্ষকের ওপর চলে আসে। বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের অনেক শিক্ষক আছেন যাঁরা এসব অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পরিচালনার জন্য আলাদা করে paid online Training গ্রহণ করেছেন। কেবলমাত্র তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার জায়গাটি আরও পরিস্কার করার জন্য। সরকারের এ সকল জনগুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক সেবামূলক কাজসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকারের কোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ছাড়াই শিক্ষকগণ এ ধরনের অনলাইন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত অনেক কর্মকর্তা মাসিক ইন্টারনেট ভাতা প্রাপ্ত হলেও শিক্ষকরা তা পাচ্ছেন না। এটা শিক্ষকদের জন্য সত্যি হতাশাজনক। এখানে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সুযোগের অসমতা নীতি দৃশ্যমান। শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব বর্তমান সরকার শিক্ষকদের চলমান অনলাইন পাঠদান কার্যক্রম মূল্যায়নপূর্বক শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি নিশ্চিতকরণের দিকে দৃষ্টি দিলে শিক্ষকরা তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও সাবলীলভাবে কাজ করতে পারবে। তাছাড়া সরকারি কলেজের শিক্ষকদের দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির সংকট বিদ্যমান রয়েছে। আশা করি, সরকার শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের আগামী দিনের পথ চলায় আরও বেশি অনুপ্রাণিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে এগিয়ে আসবেন।
তামান্না সুলতানা : সহাকারী অধ্যাপক,
নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজ (৩০তম বিসিএস)