সমাজ এক চলমান ধারা (পর্ব-৮)

প্রকাশিত: ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২১

সমাজ এক চলমান ধারা(পর্ব-৮)।
————————————————————-
প্রফেসর ননীগোপাল সরকার

দেখতে দেখতে জঙ্গলের মাঝখানে বিশাল ফাঁটল! শিকারী দলটা এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছে। তখনো মাস-বছর দিনের হিসাব তারা জানে না। সমস্ত মাটি যেনো কাঁপছে। তারা ঠিকমতো দৌড়ে নিরাপদ যায়গায় ফিরতে পারছে না। সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিলো। তবু বের হতে হয়।ক্ষুধা মানেনা পরাভব। শিকার করতেই হবে। কিন্তু তাদের অগ্রবর্তি অংশের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ভূকম্পনের ফলে ওরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। জঙ্গলের মাঝ বরাবর এখন বিশাল নদী। নদীটি দেখে খুশি হলেও দলের অপর অংশের জন্য কেমন একটা হতাশ ভাব। কেউ কেউ মুখে শিঙ্গা লাগিয়ে লম্বাটানে খুব জোরে চিৎকার দেয়। কিন্তু পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে তা মিলিয়ে যায়; কোনো প্রত্যুত্তর আসে না।
বস্তুত: অগ্রবর্তী অংশটি দক্ষিণে চলে গিয়েছে। মাঝখানে এখন বিশাল নদী তাদেরকে দু’ভাগ করে ফেলেছে– যাদের আর দেখা মেলা ভার। তবুও আশা, একদিন তারা আবার মিলিত হবে। এই বোধকরি প্রথম তাদের মনে গোষ্ঠী-চেতনা আসে। হারানোর কষ্ট আসে। বিষয়টি গোটা দলটিকে ভাবিয়ে তুলে। এর প্রভাব হয় দীর্ঘস্থায়ী। বিচ্ছিন্নতা কষ্ট দেয়। মন কেমন করে। কিন্তু তখনো হারানোর জন্য রোদনের সৃষ্টি হয় নাই। তবে মনের ভাব ফোটে ওঠে মুখে। সৃষ্টি হয় বেদনা! তারা নিজ নিজ জীবন নিয়ে কোনোরকম ফিরে আসে গুহায়। শিকার নেই! উপোষ। পেটের ক্ষিধের চেয়ে মনের কষ্ট বেশী হয় সেদিন। আর মেয়েরা হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য বিলাপ শুরু করে। সে ভাষা বোঝা যায় না, কেবল শোনা যায় ক্রন্দন। যারা ফিরতে পারলো–ওরা উত্তরের মূল অংশে রয়ে যায়। সেদিনের হারানো স্বজন আর উপোষ থেকে বৃদ্ধ লোকটি নিয়ম করলো এখন থেকে কেউ হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে তিনদিন উপোষ করতে হবে। আদিম শোক প্রকাশ!
ওরা জানতো না-তাদের গুহার অংশটি মূলত: কৈলাশের নিম্নভাগ। উপরে আছে সেন্টার অব সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার। এমনকি এক্সিস মুন্ডি, বিশ্বের নাভি এবং ভৌগলিক মেরুকেন্দ্র। আছে ইয়েতি ম্যান বা বন্য মানুষ; বাদামী ভল্লুক বা নিয়ানডারথালের আদি অংশ- তুষার মানব। এসব কথা অনেক পরের ইতিহাস। মানুষ জেনেছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ব্যাপক গবেষণার পর। তারা জানতো না-সেখানে বরফগলানো শব্দ ওম্ ওম্ শোনা যায়; আলো আর শব্দের সংঘর্ষে এরূপ ঘটে। তবে তারাও একদিন অগ্রবর্তি হয়েছিলো কৈলাশে আর অতিপ্রাকৃকতায় অবাক হয়ে বলেছিলো–ওম্ ওম্, ব্যোম্ ব্যোম্ ! মুখে নতুন এক ভাষা।

(চলবে)। ২৯|৬|২০২১।