জীবিত থেকেও মৃত দুর্গাপুর উপজেলার এক গ্রামের ৪ বাসিন্ধা

প্রকাশিত: ৬:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

এস.এম রফিক (দুর্গাপুর) নেত্রকোনাঃ

জীবিত থেকেও ভোটার আইডি কার্ডের কারণে মৃতদের তালিকায় নাম উঠেছে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলায় একই গ্রামের ৪ বাসিন্দার। নিজেদের জীবিত প্রমাণ করতে দ্বারে দ্বারে ছুটেও মেলেনি কোনো সুরাহা। তাই জমি বেচা-কেনা থেকে শুরু করে করোনাকালে সরকারের ১০ টাকা কেজি চালও ভাগ্যে জোটেনি তাদের। স্মার্ট জাতীয় পরিচয় পত্রেও আসেনি তাদের নাম। এদিকে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে আবেদন পেলেই ত্রুটি সংশোধনে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন তারা।
নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুর। এই উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বারইকান্দি গ্রামে বাস করেন ঐ চার বাসিন্দা। পাহাড় ও সমতল ভূমির এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ প্রায় কৃষিকাজ পরিচালনায় ব্যাংক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে করে থাকেন চাষবাস। কিন্তু ভোটার আইডি কার্ডের ত্রুটিজনিত কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।
তাদেরই একজন নাম,জামাল মিয়া বয়স মাত্র ৪৫। গত ১০ বছর ধরে ভোটার আইডি কার্ডে মৃত তিনি। গ্রামে ছোট-খাটো একটি ব্যবসা করেন সে। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঋণের আবেদন করেও মৃত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এই সেবা পাননি তিনি। গ্রামের একটি স্কুলে পড়াশোনা করে তার সন্তান। স্কুলে ভর্তি কিংবা অন্যান্য রেজিস্ট্রেশন এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তার আইডি কার্ড ফিরিয়ে দিয়েছেন শিক্ষক। বাধ্য হয়ে স্ত্রীর আইডি কার্ড দিয়ে সন্তানের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শেষ করতে হয়েছে তার।
জামাল মিয়ার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে থাকেন ৫৪ বছর বয়সী ইদ্রিস আলী। দুই কন্যা সন্তান ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন চাকরির। চাকরির ইন্টারভিউতে বাবার আইডি কার্ড স্থাপন করতেই পড়েন বিরম্বনায়। বাবা জীবিত অথচ আইডি কার্ডে লিখা রয়েছে মৃত। এই জটিলতার কারণে চাকরির সময়ও সমস্যায় পড়ছেন তারা।
নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে বারবার নির্বাচন অফিসে কাগজপত্র নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এখন কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছেন একই গ্রামের বাসিন্দা সুবহান মিয়া। ২০০৯ সালে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমের সময় পাশের গ্রামে একই নামের আরেক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর শুনে মৃতদের তালিকায় ঢুকে যায় তার নাম। এরপর থেকেই তার এই ভোগান্তি। ভাঙ্গাচুরা বাড়ি মেরামতে কিছুটা জমিও বিক্রি করতে পাচ্ছেন না তিনি। তাই বাধ্য হয়ে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে থাকছেন ভাঙ্গা ঘরে।
একই অবস্থা তার পাশের বাসিন্দা আছিয়া খাতুনের। গত ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি তিনি। কাগজপত্র সমস্যা ভেবে বিষয়টি তখন এড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি মৃতদের তালিকায় তার নামের বিষয়টি সামনে আসে। ৫৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা স্বামী মারা গেছে অনেক আগেই। তাই বারবার জনপ্রতিনিধিদের কাছে ছুটে গিয়ে পাননি একটি বয়স্ক ভাতা। এমনকি করোনাকালীন সময় হতদরিদ্র এই বৃদ্ধা সরকারের ১০ টাকা কেজি চালও কিনতে পারেনি।
তাদের সবার অভিযোগ তথ্য সংগ্রহকারীরা সঠিকভাবে তথ্য যাচাই করেননি। দায়িত্বে থাকা ব্রক্তিদের অবহেলার কারণে তাদের এই অবস্থা। তথ্য সংগ্রহ করার সময় তাদের কারো বাড়িতে আসেননি সংগ্রহকারী স্থানীয় এক শিক্ষক। অথচ তারপরেও মনগড়া তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয় পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হালনাগাদ করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারহানা শিরিন বলেন, তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় মৃত ব্যক্তিদের নাম কর্তন করে নিয়ে আসে। ঐ সময় দেখা যায়, কিছু ভুল তথ্যের কারণে জীবিত ব্যক্তিদের নাম মৃতদের তালিকায় চলে আসে। এইসব ক্ষেত্রে নির্বাচন অফিসে এসে নতুন করে আবেদন করলেই আমরা তাদের আবেদনগুলো প্রেরণ করে তাদের সমস্যাগুলো আইডেন্টিফাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
২৭৮.২৮ বর্গ কিলোমিটারের দুর্গাপুর উপজেলায় মোট জনসংখ্যা রয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার আটশ’ ৯৩ জন। উপজেলায় স্মার্ট জাতীয় পরিচয় পত্র দেওয়া হয়েছে এক লক্ষ ৫১ হাজার চারশ ১৮ জনকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জীবিত থেকেও মৃতদের তালিকায় নাম রয়েছে অন্তত শতাদিক ব্যক্তির। এছাড়াও দ্বৈত ভোটার রয়েছে আরও আট শতাধিক।