নিয়ন্ত্রণের বাইরে পেঁয়াজের বাজার, ব্যবসায়ীরা সতর্ক

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২১

গত কয়েক বছর ধরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দেশে পেঁয়াজের দামে ঝাঁজ দেখা যাচ্ছে। যা চলতে থাকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে এমন বছরও গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের প্রতি কেজির দাম ৩০০ টাকা ছুঁয়েছে। উড়োজাহাজে করে বিদেশ থেকে এনেও বাজার সামাল দেওয়া যায়নি। মিসর, তুরস্ক, চীন থেকেও আনতে হয়েছে পেঁয়াজ। দেশে যতসব পেঁয়াজকাণ্ড ঘটেছে তার মূলে এর আমদানির প্রধান উৎস ভারতের বাজারের গতিবিধি। ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদনে ক্ষতি হলে কিংবা দাম বাড়লে দেশেও দাম বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভারি বৃষ্টি হয়েছে ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিকে। আর নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ঢাকায়। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে এই মসলা পণ্যের দাম।

বাংলাদেশে প্রধানত শীতকালীন পেঁয়াজের চাষ হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে লাগানো পেঁয়াজ বাজারে আসে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে। এরপর আরও ছয় মাস বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ থাকে। সেপ্টেম্বর থেকে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক কমে যায়। ফলে দামও কিছুটা বাড়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ২৯ লাখ ৫৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। জমি থেকে তোলার সময় নষ্ট হওয়া, নিম্নমান ও পচে যাওয়ার কারণে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পেঁয়াজ ফেলে দিতে হয়। ফলে ৬ থেকে ৭ লাখ টন আমদানি করা হয়ে থাকে। আমদানি করা পেঁয়াজেরও ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণে নষ্ট হয়। দেশে যত পেঁয়াজ আমদানি হয় তার ৮০ ভাগের বেশি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেই আসে।

ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের ওপর আমদানিনির্ভরতা পেঁয়াজের বাজারের অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। ভারতের বাজারে দাম বাড়লে বা ভারত সরকার রপ্তানি বন্ধ করলে বাংলাদেশে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ ও ট্রাকের ভাড়া এবং ডলারের দরবৃদ্ধিও পেঁয়াজের দামে প্রভাব ফেলেছে। একশ্রেণির সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ী এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি মুনাফা করছেন, যা বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। এ ছাড়া সময়মতো সরকারি পদক্ষেপ না থাকাও অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি ভারতের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা বেঙ্গালুরু ও নাসিকে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। ফলে সেখানকার পেঁয়াজ উৎপাদন কম হয়েছে। সে দেশে সামান্য দাম বেড়েছে পণ্যটির। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমার্শিয়াল কাউন্সিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, নাসিকে রোববার প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৬ দশমিক ৫০ রুপি এবং বেঙ্গালুরুতে প্রতি কেজি ২৬ রুপি পাইকারি দরে বিক্রি হয়েছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩১ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ, অপচয়, শুল্ক্ক বাবদ কেজিতে ৫০ শতাংশ খরচ যোগ করলেও ঢাকায় পৌঁছাতে ৪৫ টাকার বেশি দাম পড়ে না। কিন্তু গতকাল ঢাকার বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দেশের ব্যবসায়ীরা নাসিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম বাড়িয়ে ফেলেছেন। ভারত কিন্তু এখনও রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত করেনি। গত রোববার বেনাপোল ও হিলিবন্দর দিয়েও কয়েকশ ট্রাক পেঁয়াজ দেশে এসেছে। গতকালও ভারত থেকে পেঁয়াজের ট্রাক আসার খবর পাওয়া গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যবসায়ী ও কৃষক পর্যায়ে চার লাখ ২১ হাজার টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে যাবে এমন কোনো ধারণা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ছিল না। দেশের পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে- এই বিবেচনায় গত মাসের শেষ সপ্তাহে টিসিবি তাদের পেঁয়াজ কেনার একটি দরপত্র বাতিল করে।

মতামত জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, পেঁয়াজ বাংলাদেশে এখনও মৌসুমভিত্তিক উৎপাদন হয়। উৎপাদন মৌসুমে এর দাম কম থাকে। আর মৌসুম শেষে দাম বাড়তে থাকে। পণ্যটি পচনশীল। ফলে ব্যাপক মজুদও সম্ভব হয় না। এদিকে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় এর আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। প্রধানত ভারত থেকে আমদানি হয়ে থাকে। ভারত রপ্তানি বন্ধ বা রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে দিলে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে মারাত্মকভাবে। এবারও তাই হয়েছে। ভারতে অতিবৃষ্টির কারণে দাম বেড়েছে। দেশের ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকার কিছু নীতি-উদ্যোগ নেয় সব সময়। এসব উদ্যোগ বাজার স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় নিলে তার ফল বেশি পাওয়া যেতে পারে। যেমন এখন শুল্ক্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুল্ক্ক কমানোর কাজ দুই মাস আগে করে বলা যেতে পারত যে, অক্টোবর থেকে বিনা শুল্ক্কে পেঁয়াজ আমদানি করা যাবে। তাহলে আগে থেকে মানুষের ধারণা থাকত যে, অক্টোবরে কম শুল্ক্কের পেঁয়াজ আসবে দেশে। বাজারে মনিটরিং আরও সুনির্দিষ্ট করা যেতে পারত।

বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, আমদানিনির্ভরতা ও পচনশীলতা প্রধান সমস্যা। এ ছাড়া পরিকল্পনার ঘাটতিও আছে। প্রতি বছর যখন একই ধরনের ঘটনা ঘটছে, সেক্ষেত্রে আগে থেকে প্রস্তুতি থাকা দরকার। কিন্তু সে রকম প্রস্তুতি দেখা যায় না। সরকারকে এ ধরনের ফসলের চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষককে উৎসাহিত করা, উন্নত বীজ উদ্ভাবন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করোনার সংক্রমণ কমে আসায় সারা বিশ্বেই এখন পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে আমদানি করে বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। এ ছাড়া কারও কাছে অস্বাভাবিক মজুদ রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দরকার। তবে বাজারে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে আমদানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে আমদানি বাড়ানোর জন্য আমদানি শুল্ক্ক কমানোর মতো সুযোগ দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বাজার পরিস্থিতি :সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, কাঁঠালবাগানসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৭৫ টাকা এবং আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও দেশি পেঁয়াজের কেজি ৪০ থেকে ৪৫ এবং আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে ছিল। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম ৫৬ শতাংশ এবং আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।

হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর রশীদ সমকালকে বলেন, ভারতে পূজার কারণে আমদানিতে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। আমদানি হয়েছে তুলনামূলক কম। ১০ অক্টোবর থেকে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৬ দিন আমদানি বন্ধ থাকবে। এ কারেণ সম্প্রতি দাম বেড়েছে। তার দাবি, পূজা শেষ হলে আমদানি বাড়বে পর্যাপ্ত পরিমাণে। দামও কমে আসবে তখন।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, ভারতে বৃষ্টিতে পেঁয়াজের ফলন কম হয়েছে। সে কারণে তারা (ভারতের ব্যবসায়ীরা) দাম বাড়িয়েছে। ভারতে বাড়লে দেশেও বেড়ে যায়। এ ছাড়া পূজার কারণে কয়েকদিন পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে দাম বাড়তি।

শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি আব্দুল মাজেদ সমকালকে বলেন, তিন বছর ধরে এ রকম সময়ে এসে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। এর পেছনে কোনো কারণ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে চাহিদা এবং সরবরাহের ওপর। মাঝেমধ্যে চাহিদা বেড়ে যায়। আবার কখনও চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বাড়ে না। তখনই দামে হেরফের হয়ে যায়।